অনিন্দ্য চৌধুরী
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুটি বিধানসভা কেন্দ্র, কিন্তু এই দুই আসনের উপনির্বাচনকে ঘিরে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার অভিঘাত যেন দুই কেন্দ্রের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। প্রশ্নটা শুধু ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে কে জিতবে, তা নয়। আসল প্রশ্ন—পশ্চিমবঙ্গের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণে তৃণমূল কংগ্রেস এবং জাতীয় কংগ্রেস কি নিজেদের আলাদা শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে, নাকি বিজেপিকে মোকাবিলায় কোনও না কোনও সময়ে আবারও পরস্পরের দিকে ফিরতে হবে? আপাতত নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর সেই প্রশ্নেরই প্রথম বড় পরীক্ষাগার।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলের দিকে তাকালে ছবিটা বেশ স্পষ্ট। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন, তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি এবং কংগ্রেস মাত্র ২টি। অর্থাৎ রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের পরে তৃণমূলের সামনে যেমন সংগঠন পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ এসেছে, তেমনই কংগ্রেসের সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের দুর্বল সাংগঠনিক ভিত্তি থেকে নতুন করে জায়গা তৈরি করার প্রশ্ন।
নন্দীগ্রামের ফল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আনে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছিলেন ১,২৭,৩০১ ভোট, তৃণমূলের পবিত্র কর পেয়েছিলেন ১,১৭,৬৩৬ ভোট। অর্থাৎ মাত্র ৯,৬৬৫ ভোটের ব্যবধান। কিন্তু কংগ্রেসের ভোট ছিল মাত্র ৭৯৪। ফলে নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের একক শক্তি বর্তমানে কতটা, তার একটি বাস্তব মাপকাঠিও পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে ব্যবধান খুব বড় না হলেও দুই দলেরই ভোটভিত্তি কংগ্রেসের তুলনায় বহু গুণ বেশি ছিল।
রেজিনগরের ছবিটা আবার সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২৬-এর নির্বাচনে হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি পেয়েছিল ১,২৩,৫৩৬ ভোট, বিজেপি ৬৪,৬৬০, তৃণমূল ৪১,৭১৮ এবং কংগ্রেস মাত্র ৪,১০১ ভোট। অর্থাৎ রেজিনগরে তৃণমূল ও কংগ্রেসের ভোট একসঙ্গে যোগ করলেও তা হুমায়ুন কবীরের ভোটের কাছাকাছি পৌঁছয় না। বরং বিজেপির ভোটও এককভাবে তৃণমূলের চেয়ে বেশি ছিল।
এই তথ্যই কংগ্রেসের বর্তমান কৌশল বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের তরফে কংগ্রেসের সঙ্গে উপনির্বাচনে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবের একটি কাঠামো ছিল—নন্দীগ্রামে কংগ্রেস লড়বে এবং রেজিনগরে তৃণমূলকে সমর্থন করবে কংগ্রেস। কংগ্রেস সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে—তৃণমূলের পক্ষ থেকে এমন কোনও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কি না, তা দলীয়ভাবে অস্বীকারও করা হয়েছে। ফলে এটিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের বদলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রভিত্তিক রাজনৈতিক দাবি হিসেবেই দেখা উচিত।
কংগ্রেসের অনাগ্রহের পিছনে যে যুক্তিটি সামনে এসেছে, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্য কংগ্রেসের একটি অংশ মনে করছে, এই মুহূর্তে তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করলে রাজ্যে নিজেদের সংগঠন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ কংগ্রেসের কাছে এই উপনির্বাচন শুধু দুটি আসনের লড়াই নয়; নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও স্বাধীন সাংগঠনিক পরিচয় পুনর্গঠনেরও একটি সুযোগ।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে অন্য প্রশ্ন। সংগঠন পুনর্গঠনের লক্ষ্য এক জিনিস, আর সেই সংগঠনকে দ্রুত নির্বাচনী সাফল্যে রূপান্তর করা অন্য জিনিস। নন্দীগ্রামে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভোট ছিল ১ শতাংশেরও কম। রেজিনগরেও ছিল ২ শতাংশের নিচে। ফলে একক শক্তিতে লড়াই করার সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অবশ্যই বজায় রাখছে, কিন্তু নির্বাচনী বাস্তবতায় সেই স্বাধীনতা কতটা ভোটে রূপান্তরিত হবে, সেটাই উপনির্বাচনের বড় প্রশ্ন।
তৃণমূলের ক্ষেত্রেও ছবিটা সহজ নয়। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে দল ৮০টি আসন পেলেও নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের মতো আসনে উপনির্বাচনের আগে দলীয় সংগঠন, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। নন্দীগ্রামে একই সঙ্গে তৃণমূলের দুই শিবিরের প্রার্থী-সমীকরণের কথাও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি দলের নির্বাচনী প্রতীক ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের বিবেচনাধীন থাকার কথাও রিপোর্ট হয়েছে।
তবে তৃণমূলের দুর্বলতার কথাও একমাত্রিকভাবে দেখলে ভুল হবে। নন্দীগ্রামে মাত্র কয়েক মাস আগে বিজেপির সঙ্গে তাদের ব্যবধান ছিল ৯,৬৬৫ ভোট। অর্থাৎ কংগ্রেসের ভোট অত্যন্ত কম হলেও তৃণমূলের নিজস্ব ভোটভিত্তি এখনও যথেষ্ট বড়। ফলে উপনির্বাচন তৃণমূলের কাছে শুধুই হারানো জমি উদ্ধারের চেষ্টা নয়; সংগঠন কতটা পুনর্গঠিত হয়েছে এবং দলীয় ভোটাররা এখনও কতটা একজোট—তারও পরীক্ষা।
রেজিনগর আবার অন্য ধরনের পরীক্ষা। সেখানে আগের নির্বাচনে হুমায়ুন কবীরের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব এবং তাঁর দলবদলের ফলে তৈরি হওয়া নতুন সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল এখানে রাবিউল আলম চৌধুরীকে এবং কংগ্রেস মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফিকে প্রার্থী করেছে। বিজেপিও প্রার্থী দিয়েছে। অর্থাৎ ত্রিমুখী বা বহুমুখী ভোটের পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র তৃণমূল-বিরোধী ভোটের যোগফল করলেই ফলাফল অনুমান করা যাবে না।
আর নন্দীগ্রাম? সেখানে রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামকে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচিত কেন্দ্র করে তুলেছিলেন। ২০২৬ সালেও তিনি আসনটি জিতেছেন, কিন্তু ভবানীপুর আসন রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়েছে। এবার বিজেপি প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরাণী রথকে প্রার্থী করেছে। ফলে বিজেপির প্রচারে শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক আবহ, নন্দীগ্রামের অতীত এবং রাজনৈতিক হিংসা-সংক্রান্ত ইস্যু গুরুত্ব পেতে পারে।
এখানেই তৃণমূল-কংগ্রেসের আলাদা লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্থ তৈরি হয়। যদি দুই দল আলাদাভাবে লড়ে, তাহলে ভোটের অঙ্কে একাধিক পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে। কিন্তু সেই ভোটভাগের ফলে কার সুবিধা হবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না—কারণ স্থানীয় প্রার্থী, সংগঠন, বিদ্রোহী প্রার্থী, ভোটারদের আচরণ এবং নির্বাচনী প্রচারের মতো বহু কারণ ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। নন্দীগ্রামে ইতিমধ্যেই তৃণমূল, কংগ্রেস, বিজেপি এবং তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের উপস্থিতির কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
তাহলে কি কংগ্রেসের একলা চলার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে তৃণমূলের সঙ্গে বৃহত্তর জোটের দরজাও বন্ধ করে দেবে? এই মুহূর্তে তার উত্তর দেওয়ার সময় আসেনি। কারণ উপনির্বাচনের আসন-সমঝোতা এবং লোকসভা নির্বাচনের বৃহত্তর জোট—দুটি রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। লোকসভা নির্বাচনে আসনসংখ্যা, রাজ্যভিত্তিক সংগঠন, জাতীয় বিরোধী রাজনীতি এবং নির্বাচনী সমীকরণ নতুন করে আলোচনার বিষয় হতে পারে। তাই নন্দীগ্রাম-রেজিনগরে সমঝোতা না হওয়াকে ভবিষ্যতের কোনও জোটের চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ এখনও নেই।
বরং এই মুহূর্তে দুই দলের রাজনৈতিক হিসাবটা আলাদা। তৃণমূলের কাছে প্রশ্ন—ক্ষমতা হারানোর পরে দলীয় সংগঠন কতটা ধরে রাখা সম্ভব এবং ভাঙনের চাপ সামলে ভোটব্যাঙ্ককে একত্র করা যায় কি না। কংগ্রেসের কাছে প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের দুর্বল সংগঠনকে আবার সক্রিয় করে স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কতটা জায়গা তৈরি করা যায়। আর বিজেপির কাছে প্রশ্ন—২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সাফল্যকে নন্দীগ্রাম-রেজিনগরের মতো উপনির্বাচনেও রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করা যায় কি না।
তাই নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের লড়াইকে শুধু ‘জোট হল না’—এই একটি বাক্যে আটকে রাখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আসলে এখানে তিনটি আলাদা রাজনৈতিক পরীক্ষা চলছে। তৃণমূল পরীক্ষা দিচ্ছে পুনর্গঠনের, কংগ্রেস পরীক্ষা দিচ্ছে পুনরুজ্জীবনের, আর বিজেপি পরীক্ষা দিচ্ছে সদ্য পাওয়া রাজ্যব্যাপী রাজনৈতিক আধিপত্যকে ধরে রাখার। ৬ অক্টোবরের ভোট এবং ৯ অক্টোবরের ফল সেই পরীক্ষার উত্তর দেবে। কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন থেকে যাবে—এই দুই উপনির্বাচনের পর তৃণমূল ও কংগ্রেস কি নিজেদের রাস্তা আলাদা রাখবে, নাকি বৃহত্তর নির্বাচনী বাস্তবতা আবার তাদের একই রাজনৈতিক টেবিলে ফিরিয়ে আনবে? সেই উত্তর এখনই নয়, সম্ভবত আগামী কয়েকটি নির্বাচনী পর্বেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে।