নন্দিতা বসু
বিশ্ব রাজনীতির আকাশে এখন একসঙ্গে অনেক মেঘ। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও যুদ্ধের আশঙ্কা, কোথাও বাণিজ্য সংঘাত, কোথাও নিষেধাজ্ঞা, কোথাও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন। পুরনো শক্তির কাঠামোর পাশাপাশি নতুন শক্তিকেন্দ্রগুলি নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। আর সেই বদলে যাওয়া পৃথিবীর মাঝখানে নয়াদিল্লিতে বসেছিল ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন। এক টেবিলে রাশিয়া, চিন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া-সহ একাধিক দেশের নেতৃত্ব। ফলে সম্মেলনটি শুধু অর্থনীতি বা বাণিজ্যের আলোচনা ছিল না; এর ভিতরে ছিল ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতির শক্তির হিসাব। আর সেই হিসাবের কেন্দ্রে ছিল ভারত।
প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক—এই সম্মেলনের শেষে ভারত কী পেল? শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক, করমর্দন, যৌথ ঘোষণা আর কূটনৈতিক সৌজন্য? নাকি এর আড়ালে তৈরি হল এমন কিছু সমীকরণ, যা আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে?
ভারতের জন্য এই সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত কোনও একটি চুক্তি নয়। বরং কথা বলার পরিসর আরও বড় হওয়া। রাশিয়ার সঙ্গে ভারত কথা বলছে, চিনের সঙ্গে কথা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সঙ্গে কথা বলছে, আবার একই সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। এই বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যেই ভারতের কূটনৈতিক শক্তির আসল পরিচয়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তার কেন্দ্রে ছিল শান্তি, সংলাপ, সহযোগিতা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের বৃহত্তর ভূমিকা। ভারতের অবস্থান ছিল স্পষ্ট—ব্রিকসকে কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে বা কোনও নির্দিষ্ট শক্তিশিবিরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেয়ে উন্নয়ন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বাস্তব মঞ্চ হিসেবে আরও কার্যকর করে তোলা প্রয়োজন। ব্রিকসের নতুন দিল্লি ঘোষণাতেও শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আরও প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এখানেই ভারতের কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বুঝতে পারছে, পৃথিবী এখন আর একক শক্তির নির্দেশে চলে না। আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চিনও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ, ইউরোপও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তিও উপেক্ষা করার মতো নয়। ফলে কোনও একটি শিবিরকে বেছে নিয়ে অন্যদের থেকে দূরে সরে যাওয়া ভারতের পক্ষে বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থকে সামনে রাখাই দিল্লির কৌশল।
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বহু দশকের সম্পর্ক। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থেকে জ্বানি—দুই দেশের সম্পর্কের শিকড় গভীরে। কিন্তু একই সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে মস্কোর সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা সহজ নয়। ভারত সেই কঠিন ভারসাম্যটাই ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ব্রিকসের মঞ্চে যুদ্ধ ও সংঘাতের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা সেই কৌশলেরই অংশ। তবে এটাও স্পষ্ট—সম্মেলন থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনও চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি বা নির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতির পথনকশা বেরোয়নি। ফলে ভারতের ভূমিকা এখানে সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর নয়। বরং ভবিষ্যতে যদি শান্তি আলোচনার কোনও সুযোগ তৈরি হয়, সেই আলোচনার দরজা খোলা রাখাই ভারতের কূটনৈতিক স্বার্থ।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তাই শুধু পুরনো বন্ধুত্বের জায়গায় আটকে নেই। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, শিল্প, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ—বিভিন্ন নতুন ক্ষেত্রে সম্পর্ক বাড়ানোর সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। অর্থাৎ পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্ককে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
তারপরই আসে চিনের প্রশ্ন।
চিন ভারতের প্রতিবেশী, অর্থনৈতিক শক্তি এবং একই সঙ্গে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। সীমান্তে উত্তেজনা ভারত-চিন সম্পর্ককে বহু বছর ধরে অস্বস্তিকর করে রেখেছে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ব্রিকসের মঞ্চে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনাও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনই বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
এর অর্থ কি ভারত-চিন সম্পর্কের সমস্ত সমস্যা মিটে গেল?
একেবারেই নয়।
বরং এর অর্থ হল, ভারত বুঝতে পারছে—চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলবে, কিন্তু যোগাযোগের দরজাও খোলা রাখতে হবে। কারণ প্রতিবেশী হিসেবে চিনকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একইসঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নেও কোনও আপসের জায়গা নেই।
এই দ্বৈত কৌশলই ভারতের কূটনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে।
একদিকে প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলা করা, অন্যদিকে তার সঙ্গে কথা বলা। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো। একদিকে ব্রিকসকে শক্তিশালী করা, অন্যদিকে সেটিকে সরাসরি পশ্চিম-বিরোধী জোটে পরিণত না করা—ভারতের সামনে এই ভারসাম্যের খেলাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আর এখানেই ভারতের সামনে রয়েছে আরেকটি বড় লক্ষ্য—উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতৃত্ব।
বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির গুরুত্ব যত বাড়ছে, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে অসন্তোষও তত বাড়ছে। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ব বাণিজ্যের কাঠামো—সব জায়গাতেই পরিবর্তনের দাবি উঠছে। ভারত চাইছে, যে পৃথিবীতে জনসংখ্যা ও অর্থনীতির ভারসাম্য বদলে গিয়েছে, সেই পৃথিবীর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটাক।
রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবি সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে ভারতের বৃহত্তর ভূমিকার পক্ষে সমর্থন দিল্লির জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার চূড়ান্ত সাফল্য বলা যাবে না। পথ এখনও দীর্ঘ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের দাবি যে আর একা ভারতের দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নেও ভারতের অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ এবং সন্ত্রাসে অর্থের জোগানের বিরুদ্ধে ভারত দীর্ঘদিন ধরে যে কঠোর অবস্থান নিয়ে এসেছে, ব্রিকসের ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান সেই দাবিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও শক্তিশালী করেছে। ভারতের জন্য এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয়।
কিন্তু ব্রিকসের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো অর্থনীতিতে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহযোগিতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা—এই ক্ষেত্রগুলিতে ব্রিকসের দেশগুলি যদি বাস্তব সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই গোষ্ঠীর গুরুত্ব আরও বাড়বে। এবারের ঘোষণাতেও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও সীমান্তপারের অর্থপ্রদানের ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। তবে একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর মতো কোনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ভারতের জন্য এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লি বিকল্প তৈরি করতে চায়, কিন্তু সরাসরি কোনও অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথে হাঁটতে চায় না। কারণ আমেরিকা ও ইউরোপ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদার। ফলে ভারতের লক্ষ্য হল—বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা, কিন্তু পুরনো সম্পর্ক ছিন্ন না করে।
এটাই ভারতের কূটনীতির সূক্ষ্মতা।
ব্রিকসের ভিতরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, স্মার্ট উৎপাদন এবং কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার—এই ক্ষেত্রগুলিতে ভারত নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের সভাপতিত্বে ডিজিটাল জনপরিকাঠামো, স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ এবং শিল্প দক্ষতা বৃদ্ধির মতো একাধিক সহযোগিতার কাঠামো সামনে এসেছে।
অর্থাৎ ভারত শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে চাইছে না; ব্রিকসকে বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নিয়ে যেতে চাইছে।
এখানেই ভারতের আরেকটি বড় শক্তি—তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা।
বিশাল জনসংখ্যার দেশে ডিজিটাল পরিচয়, ডিজিটাল লেনদেন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি এবং বৃহৎ পরিসরে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, তা অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু ব্রিকস যত শক্তিশালী হচ্ছে, তার ভিতরের সমস্যাও তত স্পষ্ট হচ্ছে।
এই জোটের সদস্য দেশগুলির স্বার্থ এক নয়। ভারত ও চিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। ইরান ও আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে নিরাপত্তাগত টানাপোড়েন রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাতের প্রভাবও রয়েছে। ফলে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা কঠিন।
এবারের সম্মেলনেও সেই কঠিন বাস্তবতার পরীক্ষা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও একটি যৌথ অবস্থানে পৌঁছনো সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত সংযম, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং কূটনৈতিক সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ভারতের জন্য এটিই হয়তো সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শিক্ষা—যেখানে মতপার্থক্য আছে, সেখানেও আলোচনার জায়গা তৈরি করা যায়।
এই জায়গাতেই “ব্রিকসের বাহুবলী” কথাটির আসল অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।
বাহুবলী হওয়া মানে শুধু সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়া নয়। বরং এমন অবস্থান তৈরি করা, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গেও আপনাকে কথা বলতে হয়, বন্ধুর সঙ্গেও আপনাকে নিজের স্বার্থের কথা বলতে হয়, আর বহু মতের মধ্যে থেকেও আপনাকে একটি সমঝোতার পথ খুঁজে বের করতে হয়।
ভারত সেই ভূমিকাতেই নিজেকে দেখতে চাইছে।
তবে এই পথ সহজ নয়।
ব্রিকস যদি শুধুই বক্তৃতা, ঘোষণা আর সম্মেলনের ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের মূল্যও সীমিত থাকবে। আসল সাফল্য তখনই, যখন বাণিজ্য বাড়বে, বিনিয়োগ আসবে, প্রযুক্তি সহযোগিতা বাস্তব হবে, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের ব্যবস্থা কার্যকর হবে, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রভাব বাড়বে।
সুতরাং ব্রিকস সম্মেলনের পর ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দিল্লি কি কূটনৈতিক প্রভাবকে বাস্তব শক্তিতে পরিণত করতে পারবে?
কারণ আজ ভারতকে উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে। বিশাল বাজার, দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, তরুণ মানবসম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক—সব মিলিয়ে ভারত এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে তার সিদ্ধান্তের আন্তর্জাতিক প্রভাব রয়েছে।
কিন্তু বিশ্বশক্তি হওয়ার পথ শুধু অর্থনীতির পথে তৈরি হয় না। সেখানে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিরতা, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা।
নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন সেই কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তারই একটি বড় পরীক্ষা ছিল।
সম্মেলন শেষ। রাষ্ট্রপ্রধানেরা ফিরে গেছেন নিজেদের দেশে। আলোচনার টেবিল গুটিয়ে গেছে। করমর্দনের ছবি, বৈঠকের ছবি, সম্মেলনের মঞ্চ—সব ধীরে ধীরে খবরের আর্কাইভে চলে যাবে। কিন্তু ভারতের সামনে এখন আসল কাজ শুরু।
ব্রিকসের মঞ্চে যে জায়গা তৈরি হয়েছে, তাকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়—সেটাই এখন প্রশ্ন।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও আলোচনা দুটোই চলবে, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়বে, আর উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতৃত্বের দাবিও আরও জোরালো হবে—এই কঠিন সমীকরণ যদি ভারত সফলভাবে সামলাতে পারে, তাহলে আগামী দশকের বিশ্ব রাজনীতিতে তার ভূমিকা আজকের তুলনায় অনেক বড় হতে পারে।
তাই “ব্রিকসের বাহুবলী” শুধু একটি উপমা নয়। এটি ভারতের সামনে থাকা একটি সম্ভাবনার নাম।
বিশ্বের শক্তির খেলায় ভারত এখন আর দর্শক নয়। প্রশ্ন হল, আগামী দিনে ভারত কি শুধু শক্তিশালী খেলোয়াড় হয়ে থাকবে, নাকি এমন এক শক্তি হয়ে উঠবে যার সঙ্গে হিসাব না কষে বিশ্ব রাজনীতির কোনও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়াই কঠিন হবে?
সময়ের উত্তর সেখানেই।