September 20, 2026 9:09 pm
September 20, 2026 9:09 pm

যে গাউনে লেখা মাতৃত্বের গল্প

Authored By:

Published on:

September 6, 2026,
2 weeks ago
Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা

অনুসুয়ান দাস

ঝলমলে পোশাক অথচ তার প্রতিটি স্তরের ভিতরে লুকিয়ে আছে অস্ত্রোপচার, মাতৃত্ব আর নতুন জীবনের জন্মের গল্পআলো ঝলমলে মঞ্চ। চারদিকে ক্যামেরার ঝলকানি। একের পর এক সুন্দরী প্রতিযোগীর পোশাকে যখন নজর আটকে যাচ্ছে, তখন হঠাৎ চোখ থেমে যায় একটি গাউনে। দূর থেকে দেখলে সেটি নিছকই একটি নান্দনিক পোশাক নরম রঙের স্তর, ভাঁজ, কাপড়ের ঢেউ, সূক্ষ্ম কারুকাজ। কিন্তু একটু কাছে তাকালেই বোঝা যায়, এই পোশাকের গল্প অন্যরকম।এ গাউন শরীরকে সাজানোর জন্য তৈরি হয়নি শুধু। বরং শরীরের ভিতরের এক অদৃশ্য যাত্রাকে দৃশ্যমান করতেই তার জন্ম।উগান্ডার সুন্দরী প্রতিযোগিতার প্রতিনিধি ত্রিভিয়া এল মুজোহা আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে পোশাকটি পরেছিলেন, তার নাম ‘লেয়ার্স অব লাইফ’—জীবনের স্তর। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে পুরো গল্প। এই পোশাকের নকশা তৈরি হয়েছে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় অতিক্রম করা শরীরের বিভিন্ন স্তরকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ, যে শরীরকে আমরা বাইরে থেকে দেখি, তার ভিতরেও যে কতগুলো স্তর, কতটা সহ্যশক্তি এবং কতটা জীবনের গল্প জমে থাকে সেই অদৃশ্য বাস্তবতাকেই ফ্যাশনের ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।একজন মায়ের ভাবনা থেকে শুরুএই অভিনব পোশাকের নেপথ্যে রয়েছেন উগান্ডার নকশাশিল্পী কিশা আবদুল্লাহ। তিনি নিজেও সদ্য মা হয়েছেন। ফলে মাতৃত্ব তাঁর কাছে কেবল দূর থেকে দেখা কোনও বিষয় নয়; নিজের শরীর, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাওয়া এক বাস্তব সত্য।সেখান থেকেই ভাবনাটি আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।মাতৃত্ব নিয়ে পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য গল্প বলা হয়েছে। কোথাও মাতৃত্বকে দেখা হয়েছে কোমলতার প্রতীক হিসেবে, কোথাও ত্যাগের। কিন্তু সন্তানের জন্মের সময় একজন নারীর শরীর ঠিক কীসের মধ্য দিয়ে যায়, সেই শারীরিক বাস্তবতা অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়।বিশেষ করে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার নিয়ে এখনও নানা ভুল ধারণা, সংকোচ এবং সামাজিক মন্তব্য রয়েছে। অথচ এটি একটি বড় অস্ত্রোপচার। সেই অভিজ্ঞতার শরীরী বাস্তবতাকে লুকিয়ে না রেখে, বরং গর্বের সঙ্গে সামনে আনতেই তৈরি হয়েছে এই পোশাক।সাত স্তরের শরীর, এক জীবনের গল্পসিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা পেটের একাধিক স্তর অতিক্রম করে জরায়ুতে পৌঁছন। সাধারণভাবে যে সাতটি স্তরের কথা বলা হয়, তার মধ্যে রয়েছে ত্বক, ত্বকের নীচের চর্বি, সংযোজক কলা বা ফ্যাসিয়া, পেটের পেশি, উদরপর্দা, জরায়ু এবং গর্ভস্থ শিশুকে ঘিরে থাকা অ্যামনিওটিক থলি।তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা আরও খানিকটা জটিল। সব ক্ষেত্রেই একই পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচার হয় না। বিশেষ করে পেটের পেশি সাধারণত সরিয়ে আলাদা করা হয়, সরাসরি কেটে ফেলা হয় না। অস্ত্রোপচারের ধরনও পরিস্থিতি ও চিকিৎসকের পদ্ধতি অনুযায়ী বদলাতে পারে।কিন্তু ফ্যাশনের ভাষায় এই সাত স্তর হয়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী প্রতীক।বাইরের ত্বক থেকে ভিতরের জরায়ু পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া যেন শুধু অস্ত্রোপচারের পথ নয়—একটি শিশুর পৃথিবীতে আসার পথও।গাউনের প্রতিটি ভাঁজে শরীরের মানচিত্রগাউনের রঙের নির্বাচনও ছিল পরিকল্পিত। লাল, গোলাপি, ক্রিম এবং ত্বকের কাছাকাছি নানা শেড একে অপরের উপর স্তর তৈরি করেছে। কোথাও কাপড়ের ঘনত্ব বেশি, কোথাও পাতলা; কোথাও একটি স্তর অন্যটিকে ঢেকে রেখেছে, আবার কোথাও পরের স্তরটি উঁকি দিয়েছে।দূর থেকে সেটি ফ্যাশন। কাছে গেলে শরীরের এক বিমূর্ত মানচিত্র।গাউনের স্তরবিন্যাস যেন মনে করিয়ে দেয়—নারীর শরীর কোনও একরৈখিক সৌন্দর্যের বস্তু নয়। তার গভীরে রয়েছে পেশি, রক্ত, ক্ষত, পরিবর্তন, যন্ত্রণা এবং অসীম পুনর্গঠনের ক্ষমতা।একটি সন্তান জন্মের পর যে শরীরকে অনেক সময় সমাজের চোখে ‘আগের মতো নেই’ বলে বিচার করা হয়, সেই শরীরই আসলে একটি নতুন জীবনকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনটাই হয়তো পোশাকটির সবচেয়ে বড় বক্তব্য।ক্ষতও কি সৌন্দর্যের অংশ হতে পারে?নারীর শরীর নিয়ে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বরাবরই কঠোর। মসৃণ ত্বক চাই, দাগহীন পেট চাই, শরীরে বয়সের চিহ্ন যেন না থাকে—এই প্রত্যাশাগুলো যেন অদৃশ্য নিয়মের মতো কাজ করে।কিন্তু মাতৃত্ব সেই শরীরকে বদলে দেয়।পেটের দাগ, অস্ত্রোপচারের চিহ্ন, ত্বকের পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একজন মায়ের নতুন শরীর। অথচ সেই পরিবর্তনকে অনেক সময় সৌন্দর্যের বিপরীত হিসেবে দেখা হয়।‘লেয়ার্স অব লাইফ’ সেই ধারণার বিরুদ্ধেই যেন নীরব প্রতিবাদ।এখানে শরীরের ভিতরের স্তরগুলো লুকোনো হয়নি। বরং সেগুলোকেই পোশাকের সৌন্দর্যের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। যেন বলা হয়েছে—যে শরীর জীবনকে ধারণ করেছে, তার কোনও স্তরই লজ্জার নয়।সিজারিয়ান—শুধু একটি অস্ত্রোপচারের নাম নয়সন্তান জন্মের পদ্ধতি নিয়ে সমাজে এখনও তুলনা চলে—স্বাভাবিক প্রসব, না কি সিজারিয়ান? কে বেশি কষ্ট পেলেন, কে বেশি ‘সহ্য’ করলেন, কার অভিজ্ঞতা বেশি স্বাভাবিক?এই তুলনাগুলির মাঝখানে প্রায়ই হারিয়ে যায় মূল মানুষটি—মা।প্রসবের পদ্ধতি যাই হোক, প্রত্যেক নারীর অভিজ্ঞতা আলাদা। কারও জন্য অস্ত্রোপচার জীবন রক্ষা করে, কারও ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে ওঠে নিরাপদে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পথ। তাই সিজারিয়ানকে দুর্বলতা, ব্যর্থতা বা কম সাহসের প্রতীক হিসেবে দেখা শুধু ভুল নয়, অন্যায়ও।এই পোশাক সেই কথাটিই অন্যভাবে বলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি প্রক্রিয়াকে এখানে পরিণত করা হয়েছে নারী-শরীরের শক্তির প্রতীকে।সুন্দরী প্রতিযোগিতার মঞ্চে অন্য এক সৌন্দর্যসুন্দরী প্রতিযোগিতার মঞ্চে পোশাক সাধারণত ব্যক্তিত্ব, সংস্কৃতি, নান্দনিকতা কিংবা দেশের পরিচয় বহন করে। কিন্তু এই গাউন তার সঙ্গে যোগ করেছে আরও একটি মাত্রা—শরীরের গল্প।উগান্ডার প্রতিনিধি ত্রিভিয়ার পরনে পোশাকটি তাই কেবল একটি নকশা নয়। এটি মাতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, নারীর শারীরিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি এবং সিজারিয়ান নিয়ে থাকা সামাজিক অস্বস্তির বিরুদ্ধে একটি দৃশ্যমান বক্তব্য।ফ্যাশন এখানে আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সুন্দর দেখানোর বিষয় থাকেনি। বরং হয়ে উঠেছে গল্প বলার মাধ্যম।নারীর শরীরের ভিতরেও একটি পৃথিবী আছেআমরা সাধারণত নারীর শরীরকে বাইরে থেকে দেখি। তার পোশাক দেখি, সৌন্দর্য দেখি, সাজ দেখি। কিন্তু একটি মায়ের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্পটি হয়তো চোখে দেখা যায় না।সেই গল্পটি লুকিয়ে থাকে চামড়ার নীচে।সেখানে আছে পেশি, টিস্যু, জরায়ু, ক্ষত এবং সুস্থ হয়ে ওঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আছে এমন এক শারীরিক ক্ষমতা, যার ফল পৃথিবীতে আসে আরেকটি মানুষ হয়ে।‘লেয়ার্স অব লাইফ’ সেই অদৃশ্য গল্পকেই দৃশ্যমান করেছে।একটি গাউন তাই মঞ্চে হাঁটতে হাঁটতে যেন একটি প্রশ্নও রেখে যায়—সৌন্দর্য বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?শুধু নিখুঁত শরীর?নাকি সেই শরীরও সুন্দর, যার উপর জীবনের চিহ্ন রয়েছে?হয়তো দ্বিতীয় উত্তরটাই আরও মানবিক।কারণ কোনও মায়ের শরীরের দাগ কেবল দাগ নয়। কোনও অস্ত্রোপচারের রেখা কেবল ক্ষত নয়। শরীরের প্রতিটি স্তরের ভিতরে কখনও কখনও একটি পরিবারের শুরু লুকিয়ে থাকে, একটি নতুন জীবনের প্রথম অধ্যায় লুকিয়ে থাকে।আর সেই কারণেই এই গাউনটির সবচেয়ে সুন্দর অলংকার হয়তো মুক্তো, পুঁতি কিংবা ঝলমলে পাথর নয়।তার আসল সৌন্দর্য—একজন নারীর শরীরকে তার সমস্ত বাস্তবতা, পরিবর্তন ও শক্তি-সহ উদ্‌যাপন করা।সাতটি স্তর পেরিয়ে যে জীবন পৃথিবীতে আসে, সেই জীবনের গল্প এবার উঠে এল ফ্যাশনের মঞ্চে। আর গাউনের প্রতিটি ভাঁজ যেন নিঃশব্দে বলে গেল—মাতৃত্ব শরীরকে বদলায় ঠিকই, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অন্যরকম সৌন্দর্য।

Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা