September 20, 2026 9:09 pm
September 20, 2026 9:09 pm

পাহাড় কি আর আগের মতো নিরাপদ?

Authored By:

Published on:

September 5, 2026,
2 weeks ago
Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা

আমি একজন ভ্রমণপিপাসু। ট্রেইল খুলে গেলে পাহাড়ের ডাক আমাকে থামাতে পারে না। বহু পাহাড়ে ঘুরেছি, বহুবার পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়েছি, কখনও কুয়াশার মধ্যে, কখনও বৃষ্টির মধ্যে, কখনও আবার মেঘের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে—এই পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু হয় না।পাহাড় আমার কাছে শুধু একটা ভ্রমণস্থান নয়। পাহাড় মানে একটা অনুভূতি। একটা টান। শহরের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে পাহাড়ের নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়ানো—এটাই তো আমার কাছে ভ্রমণের আনন্দ।কিন্তু নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ছবি আর খবরগুলো দেখার পর সেই পাহাড়ের কথাই ভাবছি অন্যভাবে।বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত চাপ তৈরি হচ্ছে। মনে হচ্ছে—আমি কি সত্যিই নিরাপদ?যে পাহাড় এতদিন আমাকে ডাকত, সেই পাহাড়ের দিকেই কি এখন একটু সাবধানে তাকাতে হবে?নেপালের পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ নেমে আসা জল, কাদা, পাথর আর ধসের যে ছবি সামনে এসেছে, তা শুধু একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছবি নয়। আমার মতো পাহাড়প্রেমী মানুষের কাছে এটা একটা বড় প্রশ্নও।পাহাড় কি বদলে যাচ্ছে? নাকি আমরা পাহাড়টাকেই বদলে দিচ্ছি?পাহাড়ে ধস নতুন ঘটনা নয়। বর্ষায় পাহাড়ে ভূমিধস হয়েছে, নদী ফুলে উঠেছে, রাস্তা বন্ধ হয়েছে—এসব আমরা বহুবার দেখেছি। কিন্তু এখন যে প্রশ্নটা আরও জোরালো হচ্ছে, তা হলো—প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তীব্রতা কি বাড়ছে?হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত—এসব নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, নির্বিচারে নির্মাণ, পর্যটনকেন্দ্রিক হোটেল-রিসর্ট, বনভূমি নষ্ট করা কিংবা পাহাড়ের স্বাভাবিক জলপ্রবাহে বাধা—তাহলে বিপদের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।আর এখানেই আমার মতো একজন পর্যটকের প্রশ্ন।আমরা কি পাহাড় দেখতে যাচ্ছি, নাকি পাহাড়কে নিজেদের মতো করে সাজাতে যাচ্ছি?একটা পাহাড়ের গায়ে বড় রাস্তা তৈরি করলাম। তার পাশে হোটেল বানালাম। আরও পর্যটক আসবে বলে নতুন নির্মাণ হলো। পাহাড় কেটে পার্কিং তৈরি হলো। নদীর ধার ঘেঁষে বাড়ি উঠল।সবকিছুর পেছনে যুক্তি একটাই—উন্নয়ন, পর্যটন, ব্যবসা।উন্নয়ন দরকার। পর্যটনও দরকার। পাহাড়ের মানুষদের অর্থনৈতিক উন্নতিও দরকার।কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতটা উন্নয়ন?যে উন্নয়ন পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত কার জন্য?আমি যখন পাহাড়ে যাই, তখন পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে যাই। পাহাড়কে জয় করতে যাই না। অথচ আমাদের উন্নয়নের ধরন কখনও কখনও এমন হয়ে দাঁড়ায়, যেন পাহাড়কে জয় করাটাই আমাদের লক্ষ্য।আর প্রকৃতি তখন নিজের ভাষায় উত্তর দেয়।কখনও ধস দিয়ে, কখনও হড়পা বান দিয়ে, কখনও হিমবাহের বরফ ও জল নেমে এসে।তবে এটাও সত্যি—নেপালের প্রতিটি বিপর্যয়ের জন্য শুধু পর্যটন, হোটেল বা রাস্তা নির্মাণকে দায়ী করা যায় না। প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি, অতিবৃষ্টি, হিমবাহের পরিবর্তনসহ একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই আবেগ দিয়ে নয়, বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করা জরুরি।কিন্তু পর্যটক হিসেবে আমার সতর্ক হওয়ার জায়গাটা কোথায়?আমার মনে হয়, পাহাড়ে যাওয়া বন্ধ করার মধ্যে সমাধান নেই।বরং পাহাড়ে যাওয়ার পদ্ধতিটা বদলাতে হবে।আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তা মানতে হবে। রাস্তা বা ট্রেকিং রুট বন্ধ থাকলে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ দেখিয়ে সেখানে যাওয়া যাবে না। স্থানীয় গাইডের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—পাহাড়কে শহরের মতো ব্যবহার করা যাবে না।কারণ পাহাড়ের নিজের একটা চরিত্র আছে। তার নিজের জলধারা আছে, নিজের ঢাল আছে, নিজের মাটি আছে। সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থাকে বুঝে উন্নয়ন না করলে বিপদ শুধু পাহাড়ে থাকা মানুষের নয়, আমার মতো পর্যটকেরও।আজ নেপালের ছবি দেখে আমার ভয় হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সেই ভয়ের কারণে পাহাড়কে ভালোবাসা বন্ধ করতে চাই না।আমি আবার পাহাড়ে যেতে চাই।আবার মেঘের মধ্যে হাঁটতে চাই। আবার পাহাড়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে দূরের বরফঢাকা চূড়া দেখতে চাই।শুধু এবার হয়তো একটা জিনিস সঙ্গে নিয়ে যাব—রোমাঞ্চের পাশাপাশি আরও একটু সচেতনতা।কারণ পাহাড় আমাদের শত্রু নয়। প্রকৃতিও আমাদের শত্রু নয়।সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা প্রকৃতির নিয়মকে উপেক্ষা করে নিজেদের নিরাপত্তার সীমাটাকেও ভুলে যাই।নেপালের বিপর্যয় তাই আমার কাছে শুধু একটা খবর নয়। একজন পাহাড়প্রেমী পর্যটক হিসেবে এটা আমার জন্য একটা প্রশ্ন—আগামী দিনে পাহাড়ে যাব তো অবশ্যই। কিন্তু পাহাড় কি আমাদের আগের মতোই গ্রহণ করবে?নাকি পাহাড় ইতিমধ্যেই আমাদের বলে দিয়েছে—“আমাকে ভালোবাসো, আমার সৌন্দর্য উপভোগ করো, কিন্তু আমাকে বদলে দিতে যেও না।”হয়তো এটাই আজকের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।পাহাড়ে ভ্রমণ বন্ধ নয়—পাহাড়কে বুঝে, পাহাড়কে সম্মান করে ভ্রমণ।

Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা