September 20, 2026 9:09 pm
September 20, 2026 9:09 pm

একশো বছর পরেও একাই একশো

একশো বছর পরেও একাই একশো

Authored By:

Published on:

September 5, 2026,
2 weeks ago
Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা

বাঙালির কাছে ‘উত্তম’ এমন একটি নাম যে নামের সঙ্গে ‘কুমার’ না বললেও চলে, পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না, শুধু ‘উত্তম’ বললেই বোঝা যায় কথা হচ্ছে সেই মানুষটির, যাঁকে একদিন বাঙালি নিজের ভালোবাসা, স্বপ্ন, রোম্যান্টিকতা আর সিনেমার আবেগ দিয়ে ‘মহানায়ক’ করে তুলেছিল। ২০২৬ সালে তাঁর জন্মের একশো বছর পূর্ণ হল। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মেছিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। একশো বছর আগে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটি কি জানতেন, একদিন তাঁর নাম বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যাবে যে তাঁকে বাদ দিয়ে সেই ইতিহাসের কথা ভাবাই কঠিন হবে? হয়তো জানতেন না। কারণ মহানায়ক হয়ে কেউ জন্মান না, মহানায়ক হয়ে ওঠার পিছনে থাকে দীর্ঘ পথ, থাকে প্রত্যাখ্যান, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা, অপমান, অপেক্ষা আর নিজেকে বারবার নতুন করে তৈরি করার জেদ। উত্তম কুমারের গল্প আসলে সেই জেদের গল্পও। যে অরুণ কুমার একদিন অভিনয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর জীবনের শুরুটা মোটেই রূপকথার মতো ছিল না। সংসারের প্রয়োজন ছিল, চাকরি করতে হয়েছিল কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে। অভিনয়ের প্রতি টান ছিল ছোটবেলা থেকেই। থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, ‘সুহৃদ সমাজ’-এর নাট্যচর্চায় অংশ নিয়েছিলেন, গানবাজনা করতেন, সিনেমা দেখতেন এবং ধীরে ধীরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা ভিতরে শক্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে তখন অনেকটা পথ। ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করলেন তিনি। কিন্তু আত্মপ্রকাশ মানেই সাফল্য নয়। একের পর এক ছবি এল, গেল, কিন্তু দর্শক তাঁকে গ্রহণ করল না। যে মানুষটিকে কয়েক বছর পরে বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে দেখা হবে, সেই মানুষটির নামের সঙ্গে তখন জুড়ে গিয়েছিল ‘ফ্লপ মাস্টার’-এর মতো তকমা। ভাবা যায়, ভবিষ্যতের মহানায়ক একসময় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন? এখানেই হয়তো উত্তম কুমারের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি সিনেমা ছাড়েননি, অভিনয় ছাড়েননি, নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি। হয়তো প্রতিটি ব্যর্থ ছবির পর তিনি আরও একটু করে বুঝেছেন ক্যামেরার সামনে নিজেকে কীভাবে মেলে ধরতে হয়, কোথায় সংযত হতে হয়, কোথায় আবেগকে চোখের ভিতর রাখতে হয়, কোথায় সংলাপের চেয়ে নীরবতা বেশি কথা বলে। তারপর এল ১৯৫৩ সাল, এল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, আর বাংলা সিনেমার ইতিহাসের একটি দরজা খুলে গেল। ছবিটি শুধু উত্তম কুমারের ভাগ্য বদলাল না, বাংলা সিনেমা পেল এমন একটি জুটি, যা পরবর্তী কয়েক দশক বাঙালির প্রেমের কল্পনার সঙ্গে একাকার হয়ে থাকবে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর পর ‘সাগরিকা’, ‘শাপমোচন’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া পাওয়া’—একটির পর একটি ছবিতে তাঁদের পর্দার রসায়ন দর্শককে এমনভাবে টেনে নিল যে উত্তম-সুচিত্রা আর শুধুমাত্র দুই অভিনেতা-অভিনেত্রী রইলেন না, তাঁরা হয়ে উঠলেন এক সময়ের বাঙালির প্রেমের প্রতীক। সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে দর্শক তাঁদের মধ্যে নিজের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। উত্তম যেন হয়ে উঠলেন সেই পুরুষ, যাকে বাঙালি কল্পনায় ভালোবাসতে পারে, যার চোখে প্রেম আছে, অভিমানে কোমলতা আছে, যার হাসিতে আশ্বাস আছে। আর সুচিত্রা সেই স্বপ্নের অপর প্রান্ত। তাঁদের জুটির জনপ্রিয়তা এতটাই গভীর ছিল যে বহু দশক পরেও তাঁদের ছবি নিয়ে আলোচনা করলে শুধু সিনেমার কথা হয় না, কথা হয় একটা সময়ের বাঙালি সমাজের কথা, সেই সময়ের প্রেমের ভাষার কথা, মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্নের কথা। কিন্তু উত্তম কুমারকে শুধুই সুচিত্রা সেনের বিপরীতে দাঁড়ানো রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি বাদ পড়ে যায়। কারণ উত্তমের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের জনপ্রিয়তার মধ্যে বন্দি না হয়ে নিজেকে বারবার ভেঙে ফেলার ক্ষমতা। তিনি বুঝেছিলেন, তারকা হওয়া আর অভিনেতা হয়ে ওঠা এক নয়। তাই সময়ের সঙ্গে চরিত্র বদলেছেন, অভিনয়ের ধরন বদলেছেন, নিজেকে অন্য পরিচালকের হাতে তুলে দিয়েছেন, এমন চরিত্র গ্রহণ করেছেন যেখানে তাঁর চেনা নায়ক-ইমেজের কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। সেই পথেই এসেছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালের সেই ছবি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নয়, উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনেরও এক মোড়। অরিন্দম মুখোপাধ্যায়—একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা, বাইরে থেকে যার জীবন সাফল্যে পরিপূর্ণ, অথচ ভিতরে রয়েছে ভয়, অপরাধবোধ, আত্মসংঘাত, অনিশ্চয়তা আর একাকিত্ব। ‘নায়ক’-এর অরিন্দম যেন পর্দার উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিল। যে অভিনেতাকে দর্শক এতদিন প্রেমিক, নায়ক, সুদর্শন যুবক হিসেবে দেখে এসেছে, সেই অভিনেতাই এবার নিজের তারকা-পরিচয়কে যেন নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করলেন—সাফল্য আসলে কী? জনপ্রিয়তা কি সুখের সমান? মানুষের করতালি কি একাকিত্ব দূর করতে পারে? সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারের মধ্যে যে অভিনেতাটিকে চিনেছিলেন, ‘নায়ক’ সেই অভিনেতারই এক অসাধারণ প্রকাশ। ছবির ট্রেনের ভিতর দিয়ে অরিন্দমের স্মৃতি, ভয় আর আত্মসমীক্ষা যত এগোয়, ততই দর্শক বুঝতে পারে—মহানায়কের ভিতরেও একজন ভীত, দ্বিধাগ্রস্ত, অসম্পূর্ণ মানুষ থাকতে পারে। এই অভিনয় উত্তমের তারকা-পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তাঁকে একজন বড় অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এর পরেই আসে ‘চিড়িয়াখানা’, যেখানে উত্তম কুমার ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্রে। তারপর ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, সম্পূর্ণ অন্য এক জগতের চরিত্র, এক বিদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের জীবন, গান, পরিচয় আর বাংলার সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। ১৯৬৭ সালে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ এবং ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান পান উত্তম কুমার। যে মানুষকে একদিন ‘ফ্লপ মাস্টার’ বলা হয়েছিল, তিনিই কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় স্তরে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পেলেন—এই যাত্রাটাই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। কারণ সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও তিনি নিজের জনপ্রিয়তার নিরাপদ জায়গায় বসে থাকেননি। বরং তিনি নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। সিনেমা তাঁর কাছে শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলার জায়গা ছিল না। প্রযোজনা করেছেন, পরিচালনা করেছেন, সংগীত পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, গান গেয়েছেন, চলচ্চিত্রের নানা কাজে নিজেকে জড়িয়েছেন। অর্থাৎ তিনি সিনেমাকে পেশা হিসেবে দেখেননি শুধু, সিনেমাকে বাঁচতেন। তাঁর কণ্ঠে অন্য শিল্পীর গান পর্দায় এমনভাবে প্রাণ পেত যে দর্শকের মনে হত গানটি যেন উত্তমই গাইছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, কিশোর কুমারের মতো শিল্পীদের কণ্ঠ তাঁর পর্দার চরিত্রকে নতুন জীবন দিয়েছে, আর উত্তম তাঁর অভিনয় দিয়ে সেই গানকে চরিত্রের আবেগে পরিণত করেছেন। একটি গানকে শুধু ঠোঁট মেলানো নয়, অভিনয় করে তোলা—এই শিল্পটিও তাঁর জনপ্রিয়তার বড় অংশ ছিল। উত্তম কুমারের সাফল্যকে বুঝতে গেলে সেই সময়ের বাংলাকেও বুঝতে হয়। স্বাধীনতার পরের বাংলা, দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু মানুষের জীবন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন—এই বাস্তবতার মধ্যেই মানুষ সিনেমা হলে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অন্য জীবন দেখতে চাইত। উত্তম সেই স্বপ্নের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ছবির পৃথিবী হয়তো বাস্তবের হুবহু প্রতিচ্ছবি ছিল না, কিন্তু তাঁর চরিত্রের আবেগ ছিল খুব পরিচিত। প্রেমে পড়া, হারিয়ে ফেলা, অভিমান করা, ফিরে আসা, ভুল করা, ক্ষমা চাওয়া—সবকিছুতেই দর্শক নিজের জীবনের কোনও না কোনও অংশ খুঁজে পেত। তিনি রাজপুত্রের মতো দেখতে হয়েও বাঙালির কাছে দূরের মানুষ হয়ে ওঠেননি, বরং আশ্চর্যভাবে ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। হয়তো পাশের বাড়ির কেউ, হয়তো ট্রামে দেখা কোনও যুবক, হয়তো পাড়ার আড্ডার পরিচিত মানুষ। তাঁর হাসির মধ্যে বাঙালি নিজের হাসি খুঁজে পেয়েছিল, তাঁর বিষণ্ণতায় নিজের কষ্ট, তাঁর প্রেমে নিজের প্রেম। এই আপন হয়ে ওঠাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। আর তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও স্বাভাবিকভাবেই জনমানসে প্রবল কৌতূহল তৈরি করেছিল। গৌরী দেবীর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য, পরবর্তী সময়ে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—সবই দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে। এই অধ্যায় উত্তমের জীবনের সহজ কোনও অধ্যায় নয়, এখানে ব্যক্তিগত আবেগ, সামাজিক প্রশ্ন, সম্পর্কের জটিলতা এবং বিতর্ক সবই আছে। কিন্তু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকানোর সময় হয়তো এটাও মনে রাখা দরকার যে মহানায়ক শব্দটির আড়ালেও একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর ভুল ছিল, দ্বন্দ্ব ছিল, আবেগ ছিল, দুর্বলতা ছিল। তাঁকে দেবতার আসনে বসিয়ে দিলে মানুষ উত্তম কুমারকে আর দেখা যায় না। অথচ তাঁর জীবনের আকর্ষণ এখানেই যে তিনি দেবতা ছিলেন না, মানুষ ছিলেন। আর সেই মানুষই নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম এবং সময়ের সঙ্গে তৈরি করেছিলেন এক কিংবদন্তি। উত্তম কুমারের কলকাতাকেও তাঁর গল্প থেকে আলাদা করা যায় না। সেই কলকাতা, যেখানে ট্রাম ধীরে চলত, রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে সিনেমা নিয়ে আলোচনা হত, পাড়ার দেওয়ালে নতুন ছবির পোস্টার লাগলে মানুষ দাঁড়িয়ে পড়ত, সিনেমা হলের সামনে লম্বা লাইন পড়ত, রেডিয়োয় গান বাজত, আর কোনও নতুন উত্তম-সুচিত্রা ছবি মুক্তি পেলে সেটি যেন পাড়ার সামাজিক ঘটনাই হয়ে উঠত। আজকের ডিজিটাল যুগে যেখানে একটি সিনেমার প্রচার কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, পোস্টার আর সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণায় ছড়িয়ে পড়ে, সেই সময়ে একটি ছবি মানুষের কাছে পৌঁছত পোস্টার, সংবাদপত্র, রেডিয়ো আর মুখে মুখে। সেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুখগুলির একজন ছিলেন উত্তম কুমার। তাঁর নামই অনেক সময় ছিল ছবির অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু জনপ্রিয়তারও একটা মূল্য আছে। তারকার কাছে প্রত্যাশা বাড়ে, দর্শকের প্রত্যাশা বাড়ে, প্রযোজকের প্রত্যাশা বাড়ে, নিজের কাছেও প্রত্যাশা বাড়ে। উত্তম কুমার সেই চাপের মধ্যেই কাজ করেছেন। একই ধরনের চরিত্র বারবার করার প্রলোভন ছিল, কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে নিজের বয়স ও সময়ের সঙ্গে চরিত্র বদলেছেন। রোম্যান্টিক নায়ক থেকে পরিণত মানুষ, প্রেমিক থেকে স্বামী, সাধারণ মানুষ থেকে জটিল চরিত্র—নিজের ইমেজকে তিনি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে দিয়েছেন। হিন্দি সিনেমাতেও কাজ করেছেন, সর্বভারতীয় দর্শকের কাছে পরিচিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর আসল ঘর থেকে গেছে বাংলা। বাংলা ভাষা, বাংলা সিনেমা, বাংলা দর্শক—এই তিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও আলগা হয়নি। তাঁর জীবনের শেষ দিকেও কাজের ব্যস্ততা ছিল। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাস যেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে। ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র শুটিং চলছিল। ২৩ জুলাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। পরদিন, ২৪ জুলাই ১৯৮০, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হল। যে মানুষটিকে বাঙালি এতদিন পর্দায় দেখে এসেছে, যে মানুষটির সঙ্গে বহু মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, তাঁর চলে যাওয়ার খবর যেন কলকাতার বুক থেকে হঠাৎ কোনও পরিচিত শব্দ কেড়ে নিল। কিন্তু সেখানেই যেন শুরু হল উত্তম কুমারের দ্বিতীয় জীবন। সাধারণত কোনও তারকার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সময়ের সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তাও ধীরে ধীরে কমে আসে। নতুন প্রজন্ম আসে, নতুন নায়ক আসে, নতুন সিনেমা আসে, পুরনো তারকারা ইতিহাস হয়ে যান। উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটল। যত সময় গেল, তাঁর কিংবদন্তি যেন আরও শক্ত হল। নতুন প্রজন্ম তাঁর সিনেমা দেখতে শুরু করল। ‘নায়ক’ নতুন করে আলোচিত হল। ‘সপ্তপদী’ আবার প্রেমের গল্প হয়ে ফিরে এল। ‘হারানো সুর’ নতুন দর্শক পেল। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ দেখিয়ে দিল জনপ্রিয় নায়ক কীভাবে চরিত্রাভিনেতা হয়ে উঠতে পারেন। ‘চিড়িয়াখানা’য় ব্যোমকেশ আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হল। সাদা-কালো পর্দা পেরিয়ে তিনি এলেন টেলিভিশনে, ভিডিও ক্যাসেটে, পরে ইউটিউব ও ডিজিটাল মাধ্যমে। প্রযুক্তি বদলেছে, সিনেমা দেখার পদ্ধতি বদলেছে, দর্শকের ভাষা বদলেছে, কিন্তু উত্তম কুমারের সঙ্গে দর্শকের সম্পর্ক বদলায়নি। বরং প্রতি প্রজন্ম তাঁকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করেছে। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে কলকাতা এবং বাংলা আবার তাঁকে নতুন করে স্মরণ করছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শন, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, তাঁর নামে চলচ্চিত্রকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ—সব মিলিয়ে শতবর্ষে ফিরে আসছে সেই নাম, যে নামটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, উত্তম কুমারকে স্মরণ করার জন্য কোনও অনুষ্ঠান প্রয়োজন হয় না। দরকার শুধু একটি পুরনো সিনেমা। দরকার একটি সন্ধ্যা। দরকার একটু মন দিয়ে পর্দার দিকে তাকানো। তাহলেই দেখা যায়, অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় আবার হেঁটে আসছেন। কখনও কৃষ্ণেন্দুর মতো, কখনও আলোকের মতো, কখনও অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের মতো, কখনও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মতো, কখনও ব্যোমকেশের মতো। চরিত্র বদলেছে, পোশাক বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু মানুষটির চোখের ভাষা বদলায়নি। আর তখনই বোঝা যায় কেন উত্তম কুমার এখনও প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি শুধু একটি সময়ের নায়ক নন, তিনি মানুষের আবেগের অভিনেতা। প্রেমের গল্প বদলায়, কিন্তু প্রেম থাকে। মানুষের একাকিত্বের ধরন বদলায়, কিন্তু একাকিত্ব থাকে। সাফল্যের সংজ্ঞা বদলায়, কিন্তু সাফল্যের ভিতরের ভয় থাকে। সম্পর্কের ভাষা বদলায়, কিন্তু অভিমান থাকে। আর এই জায়গাগুলিতেই উত্তম কুমার আজও ফিরে আসেন। একজন বৃদ্ধের কাছে তিনি যৌবনের স্মৃতি, একজন মধ্যবয়স্ক মানুষের কাছে শৈশবের সিনেমা, কারও কাছে প্রথম প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মুখ, কারও কাছে বাবার প্রিয় নায়ক, কারও কাছে মায়ের মুখে শোনা পুরনো দিনের গল্প। আর নতুন প্রজন্মের কাছে? হয়তো প্রথমে তিনি শুধুই পুরনো দিনের এক সুদর্শন অভিনেতা। কিন্তু ‘নায়ক’ দেখার পর সেই ধারণা বদলায়, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ দেখার পর বদলায়, ‘সপ্তপদী’ দেখার পর বদলায়। তখন বোঝা যায়, কেন এই মানুষটিকে শুধু তারকা বলা যায় না। তিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে দিয়েছেন যে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তাঁর উপস্থিতির মৃত্যু হয়নি। একশো বছর আগে জন্মেছিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। একদিন তিনি উত্তম কুমার হলেন। তারপর উত্তম থেকে মহানায়ক। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো কোনও অভিধাই নয়। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির নিজের মানুষ। যে মানুষটি একসময় ব্যর্থ হয়েছিল, যে মানুষকে ‘ফ্লপ মাস্টার’ বলা হয়েছিল, সেই মানুষই কয়েক বছরের মধ্যে এমন এক জায়গায় পৌঁছলেন যেখানে তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই আর পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। এই জায়গা কোনও পুরস্কার দিয়ে পাওয়া যায় না, কোনও প্রচার দিয়ে তৈরি করা যায় না। এটি তৈরি হয় দর্শকের ভালোবাসায়, সময়ের পরীক্ষায়, প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিতে। উত্তম কুমার সেই পরীক্ষায় পাস করেছেন। একশো বছর পরেও তিনি বেঁচে আছেন শুধু তাঁর ছবিতে নয়, বাঙালির কথায়, গানে, স্মৃতিতে, নস্টালজিয়ায়। হয়তো এটাই একজন মহানায়কের সবচেয়ে বড় সাফল্য—তিনি নিজের সময়কে অতিক্রম করতে পারেন। তাঁর শরীরের বয়স থেমে যায়, কিন্তু তাঁর শিল্পের বয়স বাড়ে না। সাদা-কালো পর্দায় তিনি এখনও তরুণ, এখনও তাঁর চোখে সেই পরিচিত দৃষ্টি, ঠোঁটে সেই হাসি, সংলাপে সেই মায়া। সুচিত্রা সেনের দিকে তাকালে এখনও মনে হয় কোনও অসমাপ্ত কথা রয়ে গেল। ‘নায়ক’-এর অরিন্দম এখনও ট্রেনের জানালার পাশে বসে নিজের ভিতরের মানুষটির সঙ্গে কথা বলছে। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ এখনও গান ধরছে। ব্যোমকেশ এখনও রহস্যের দিকে তাকিয়ে আছে। আর কোনও এক পুরনো কলকাতার সিনেমা হলের অন্ধকারে যেন এখনও ভেসে আসছে মানুষের ফিসফিসানি—উত্তম এসেছে। একশো বছর পেরিয়েও তাই তিনি অতীত নন। তিনি বর্তমানেরও অংশ। সময় চলে যায়, নায়ক বুড়ো হয়, ছবি পুরনো হয়, সিনেমার ভাষা বদলায়, দর্শক বদলায়—কিন্তু কিছু মুখের বয়স বাড়ে না। উত্তম কুমার তেমনই এক মুখ। তাই জন্মের একশো বছর পরেও তাঁর নামের পাশে সবচেয়ে স্বাভাবিক শব্দটি এখনও একই—মহানায়ক। আর বাঙালি যখন তাঁকে স্মরণ করে, তখন হয়তো আসলে একজন অভিনেতাকে নয়, নিজেরই এক টুকরো অতীতকে ছুঁয়ে দেখে। সেই অতীত, যা পুরনো হয়েও কোনওদিন সম্পূর্ণ পুরনো হয় না। সেই মানুষ, যাঁর জন্য একদিন বাংলা সিনেমা পেয়েছিল তার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। সেই মানুষ, যাঁকে সময় নিয়ে যেতে পারেনি। তাই একশো বছর পরেও তিনি উত্তম।

Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা