September 20, 2026 9:09 pm
September 20, 2026 9:09 pm

নীল সাগরের রূপকথা

Authored By:

Published on:

September 6, 2026,
2 weeks ago
Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা


কলকাতা স্টেশনের কোলাহল আর বিমানের ডানায় ভর করে কখন যে উপসাগরের বুকে জেগে থাকা এই ছোট্ট স্বর্গে এসে পৌঁছালাম, ভাবলে এখনো একটা ঘোর লাগে। বিমান থেকে যখন ফু কোক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখলাম, তখন দুপুরের চড়া রোদ মরে এসেছে। তবে প্রথম চমকটা বিমানবন্দর ছাড়ার আগেই মিলল ভিয়েতনামের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার জন্য ভারতীয়দের ভিসার প্রয়োজন হলেও, এই ‘মুক্তো দ্বীপে’র জন্য কোনো ভিসাই লাগল না। কোনো ঝঞ্ঝাট ছাড়াই পাসপোর্ট সিল করিয়ে যখন বাইরে এলাম, তখন বিকেলের ফুরফুরে হাওয়া আমাদের স্বাগত জানাল। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চললাম আমাদের আস্তানার দিকে। লং বিচ এলাকার সমুদ্রমুখী একটা চমৎকার রিসোর্ট বেছে নিয়েছিলাম আমরা দুজনে। রুমে ব্যাগটা রেখেই আর তর সইছিল না। কাঁচের দরজা ঠেলে বারান্দায় আসতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। মাইলের পর মাইল ছড়ানো সোনালী বালুকাতট আর তার বুক ছুঁয়ে থাকা নীল জলরাশি। ঠিক তখনই পশ্চিম আকাশে সূর্যটা টকটকে লাল আবির ছড়িয়ে সমুদ্রের বুকে তলিয়ে যাচ্ছিল। দিগন্তজোড়া সেই সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আমরা দুজনে এক অদ্ভুত শান্তিতে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। মনে হলো, সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও। সন্ধ্যায় আমরা রওনা হলাম দুওং দং নাইট মার্কেটের দিকে। চারদিকে লাল-নীল রঙিন লণ্ঠন জ্বলছে, আর বাতাসে ভাসছে সামুদ্রিক মাছ ভাজার সুবাস। সার সার দোকান, আর তাতে থরে থরে সাজানো জ্যান্ত লবস্টার, কাঁকড়া, অক্টোপাস আর নানা অচেনা মাছ। আমরা একটা ছোট দোকানে বসে অর্ডার করলাম গ্রিলড সী-ফুড আর ভিয়েতনামের বিখ্যাত ‘রোলড আইসক্রিম’। চোখের সামনে তাজা মাছ গ্রিল করে প্লেটে সাজিয়ে দিল, মুখে দিতেই মনে হলো এর স্বাদ সারাজীবন মনে থাকবে।পরের দিন সকালটা ছিল একদম অন্যরকম এক রোমাঞ্চের। আমাদের গন্তব্য ছিল দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত, যেখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম ওভার-সী ক্যাবল কার। প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ক্যাবল কারের কাঁচের কেবিনে যখন আমরা বসলাম, তখন বুকটা মৃদু কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু কেবিনটা চলতে শুরু করতেই সেই ভয় উবে গিয়ে জায়গা নিল এক অপার্থিব বিস্ময়। নিচে তাকাতেই দেখি পান্না-সবুজ সমুদ্রের স্বচ্ছ জল, আর তাতে ভাসছে শত শত রঙিন মাছ ধরার নৌকা। ঠিক যেন কোনো নিপুণ শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা ছবি! ওপারে হন থোম দ্বীপে নেমে কিছুটা সময় কাটিয়ে বিকেলে আমরা গেলাম ‘সানসেট টাউন’-এ। ধবধবে সাদা ইতালীয় স্থাপত্যের আদলে তৈরি এই শহরটি দেখে মনেই হচ্ছিল না আমরা এশিয়ায় আছি। সন্ধ্যায় সেখানে সমুদ্রের বুকে আলো ও আতশবাজির এক জাদুকরী কোরিওগ্রাফি ‘কিস অফ দ্য সি’ দেখে আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলাম।ভ্রমণের তৃতীয় দিনটা আমরা উৎসর্গ করলাম প্রকৃতির আদিম রূপের কাছে। একটা স্কুটার ভাড়া করে আমরা দুজনে চললাম উত্তর দিকে। ফু কোক ন্যাশনাল পার্কের ঘন সবুজ জঙ্গলের বুক চিরে তৈরি ফাঁকা রাস্তা দিয়ে স্কুটার চালানোর অনুভূতিটাই ছিল স্বর্গীয়। আমাদের গন্তব্য ছিল র্যাচ ভেম বা স্টারফিশ বিচ। সেখানে পৌঁছে জুতো জোড়া হাতে নিয়ে যখন হাঁটু সমান স্বচ্ছ পানিতে নামলাম, আমাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। বালির ওপর শুয়ে আছে শত শত উজ্জ্বল লাল রঙের বুনো তারা-মাছ বা স্টারফিশ। আলতো করে ছোঁয়া গেলেও তাদের জল থেকে তোলার নিয়ম নেই, তাই আমরা সেই প্রকৃতির অপার সৃষ্টিকে শুধু ক্যামেরাবন্দী আর মনের মণিকোঠায় জমিয়ে রাখলাম। সেখান থেকে ফেরার পথে ঘুরে এলাম ‘গ্র্যান্ড ওয়ার্ল্ড’। ইতালির ভেনিস শহরের আদলে তৈরি কৃত্রিম খালের বুকে রঙিন নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো আর দুপাশের রঙিন বাড়িগুলোর মায়াবী আলো আমাদের এক রূপকথার দেশে নিয়ে গিয়েছিল।শেষের আগের দিনটা আমাদের একটু আবেগপ্রবণ করে তুলল। সকালে আমরা গেলাম ফু কোক প্রিজন মিউজিয়ামে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বন্দীদের ওপর যে অমানুষিক অত্যাচার চালানো হতো, তার ইতিহাস এখানে পুতুলের মাধ্যমে জীবন্ত করে রাখা হয়েছে। ইতিহাস আমাদের মনকে কিছুটা ভারী করে দিয়েছিল, তাই মন ভালো করতে দুপুরের পর চলে গেলাম দ্বীপের সবচেয়ে সুন্দর সৈকত বা সাও বিচে। ধবধবে সাদা পাউডারের মতো বালু আর শান্ত কাঁচের মতো জল। সমুদ্রের পাড়ে হেলে পড়া একটা নারকেল গাছের ডাল থেকে ঝুলছিল একটা কাঠের দোলনা। সেই দোলনায় বসে দুজনে ডাবের জল খেতে খেতে সমুদ্রের গর্জন শোনার যে মায়াবী অনুভূতি, তা কোনোদিন ভোলার নয়।পঞ্চম দিন সকালে যখন বিদায়ের ঘণ্টা বাজল, মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। হোটেল থেকে বেরোনোর আগে স্মারক হিসেবে কিনে নিলাম ফু কোকের বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি গোলমরিচ। বিমানবন্দর পানে যাওয়ার সময় কেবলই মনে হচ্ছিল, আধুনিক বিনোদন আর আদিম প্রকৃতির এমন অদ্ভুত যুগলবন্দী খুব কম জায়গাতেই বোধহয় দেখা যায়। ফু কোক আমাদের শুধু একটা ভ্রমণ দিল না, দিয়ে গেল দুজনে মিলে আজীবন রোমন্থন করার মতো এক মুঠো রূপকথার গল্প।

পিয়ালী কর

Related Stories

প্রতীকহীন

জোটের দরজা বন্ধ, নাকি খুলবে নতুন পথ

ব্রিকসের বাহুবলী

বিদায় নীল সাদা